উপসাগর থেকে তেল পাচারে ইরানের ‘চোরাচালান’ কৌশল ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি রপ্তানি সচল রাখতে ওমানের সোহার বন্দর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ফুজাইরাহ উপকূলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে একের পর এক গোপন ‘শিপ-টু-শিপ’ (জাহাজ থেকে জাহাজে) তেল স্থানান্তর করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর...
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি রপ্তানি সচল রাখতে ওমানের সোহার বন্দর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ফুজাইরাহ উপকূলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে একের পর এক গোপন ‘শিপ-টু-শিপ’ (জাহাজ থেকে জাহাজে) তেল স্থানান্তর করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান যে ধরনের ছদ্মবেশী কৌশল ব্যবহার করে আসছিল, এবার যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেই হরমুজ প্রণালির প্রান্তে হুবহু সেই কৌশল ব্যবহারের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই গোপন অভিযানের বিস্ফোরক তথ্য ফাঁসের পর বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এই কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ও পরিচিত ১১ জন ব্যক্তির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রয়টার্স এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে। স্যাটেলাইট চিত্রে গোপন মিশনের প্রমাণ রয়টার্সের পর্যালোচনা করা শিপিং ডেটা ও স্যাটেলাইট চিত্র অনুসারে, গত মে মাসের শুরুতে এই গোপন জ্বালানি মিশন শুরু হয়। এ পর্যন্ত অন্তত ১১৬টি জাহাজ এই ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে। আকাশ ও নৌ ড্রোন এবং সামরিক হেলিকপ্টার ব্যবহার করে এই জ্বালানি কনভয়গুলোকে অপেক্ষমাণ ট্যাংকারের দিকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া অতিসাম্প্রতিক চিত্রে দেখা গেছে, গত মঙ্গলবার সকালেও ওমান উপসাগরে ১২ জোড়া বিশাল আকৃতির জাহাজ পাশাপাশি অবস্থান করে তেল স্থানান্তর করছিল। এর মধ্যে আটটি ওমানের সোহার উপকূলে এবং চারটি ফুজাইরাহর কাছাকাছি অবস্থান করছিল। এর আগে গত ১১ জুন এই গোপন তৎপরতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়; সেদিন স্যাটেলাইট চিত্রে দুটি স্থানে একসঙ্গে রেকর্ডসংখ্যক ১৭ জোড়া জাহাজকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে তেল স্থানান্তর করতে দেখা যায়। অ্যাপাচি ভূপাতিত ও প্রতিশোধমূলক হামলা এই গোপন অভিযানের গভীরতা আরও স্পষ্ট হয় গত ৯ জুনের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ওমান উপসাগরের মিশন চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যাধুনিক ‘অ্যাপাচি’ সামরিক হেলিকপ্টার ভূপাতিত হয়। এর পরপরই মার্কিন বাহিনী ওই অঞ্চলে ব্যাপক প্রতিশোধমূলক বোমা হামলা চালায়। হামলার বিষয়ে অবগত একজন সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাসহ চারজন নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছেন, ভূপাতিত ওই অ্যাপাচি হেলিকপ্টারটি মূলত এই গোপন তেল স্থানান্তর মিশনের সুরক্ষায় নিয়োজিত ছিল। রয়টার্সের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঠিক যেদিন অ্যাপাচিটি ভূপাতিত হয়, সেদিন সোহার বন্দরের অদূরে একটি ছোট এবং সুনির্দিষ্ট এলাকায় ছয় জোড়া ট্যাংকার জড়ো করে রাখা হয়েছিল। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের রহস্যজনক অবস্থান এই অভিযানে অ্যাপাচি হেলিকপ্টারটি ঠিক কী ভূমিকা পালন করছিল, তা রয়টার্স স্বাধীনভাবে পুরোপুরি নিশ্চিত করতে পারেনি। তবে এ বিষয়ে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে হোয়াইট হাউস বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে সরাসরি সেন্টকমের সঙ্গেই যোগাযোগের পরামর্শ দেয়। অন্যদিকে, একজন মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে জানান, সমুদ্রের বুকে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের কোনো কার্যক্রমে সেন্টকমের বাহিনী সরাসরি অংশ নিচ্ছে না। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা এটি স্বীকার করেছেন যে, অ্যাপাচি ভূপাতিত হওয়ার পর অত্যন্ত অত্যাধুনিক ড্রোন নৌকার সাহায্যে হেলিকপ্টারের দুই ক্রুকে সফলভাবে উদ্ধার করা হয়েছিল। এই স্থানান্তর নিয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সাড়া পাওয়া যায়নি। আইআরজিসি-র হামলার ঝুঁকিতে মার্কিন কনভয় ওমান উপসাগরে হরমুজ প্রণালির প্রস্থানপথের কাছাকাছি যে দুটি সুনির্দিষ্ট স্থানে এই ঝুঁকিপূর্ণ তেল স্থানান্তর ঘটছে, তা 'পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ'-এর টানা সীমানার অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থিত। এই নতুন সংস্থাটি হরমুজ প্রণালি পরিচালনার জন্য ইরান সম্প্রতি গঠন করেছে। সংশ্লিষ্ট সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই জলসীমায় ইরানের নির্দেশ অমান্যকারী যেকোনো জাহাজ বা কনভয় যেকোনো মুহূর্তে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ড্রোন ও নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। আর এই ঝুঁকি এড়াতেই মার্কিন বাহিনী এত নিখুঁত ও অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এই মিশন পরিচালনা করছে, যার বিশদ বিবরণ এর আগে কোনো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়নি।
