মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে নিহত ও আহতদের আলোকচিত্রের প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ডা. জুবাইদা রহমান। গতকাল ঢাকায় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি অডিটরিয়ামে। ছবি : পিআইডি ‘প্রতিদিন রাতে ওর ফ্ল্যাশব...
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে নিহত ও আহতদের আলোকচিত্রের প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ডা. জুবাইদা রহমান। গতকাল ঢাকায় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি অডিটরিয়ামে। ছবি : পিআইডি ‘প্রতিদিন রাতে ওর ফ্ল্যাশব্যাক হয়। দুঃস্বপ্ন দেখে, ভয় পায়। ঘুমের মধ্যে মাঝে মাঝে চিৎকার করে ওঠে। মাঝে তিন মাস কারো সঙ্গেই কথা বলত না ও। কাউন্সেলিং করানোর পর এখন কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।’ কথাগুলো বলছিলেন গত বছর ২১ জুলাই রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনায় অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাবিদ নাওয়াজ দীপ্তর মা নুরুন নাহার চৌধুরী। আগুনে দীপ্তর শরীরের ৫২ শতাংশ পুড়ে যায়। গতকাল মঙ্গলবার সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার এক বছর পূর্ণ হয়েছে। নুরুন নাহার চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার সন্তানের যে ক্ষতি হয়েছে, তা কোনো কিছু দিয়েই কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কোনো কিছুতেই পূরণ হবে না। আমার সন্তান প্রতিনিয়ত সাফার করছে। প্রতিনিয়ত ও কষ্ট পাচ্ছে, স্বাভাবিকভাবে পড়াশোনা করতে পারছে না, ওর হাত দিয়ে এখনো ভালোভাবে লিখতে পারে না। বড্ড ট্রমার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।’ ক্লাসে দীপ্তর যেসব বন্ধু ছিল, সবাই মারা গেছে বলে জানান দীপ্তর মা। এই খবর তিন মাস দীপ্তকে জানানো হয়নি। নুরুন নাহার বলেন, ‘দীপ্তকে আমরা বলেছিলাম যে তোমার বন্ধুরা অন্য ফ্লোরে চিকিৎসা নিচ্ছে। কাউন্সেলিং করানো হচ্ছে। চিকিৎসকদের পরামর্শে চলতে হচ্ছে। আর সরকারের পক্ষ থেকে যে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা ছিল, তা দেওয়াও হয়নি। একই সঙ্গে তা আমরা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছি।’ সরকারের পক্ষ থেকে আহত শিক্ষার্থীদের সহায়তায় পাঁচ লাখ এবং নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ২০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু এখনো এই প্রতিশ্রুতি পূরণ করা হয়নি। হতাহত শিক্ষার্থীদের বেশ কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ক্ষতির তুলনায় এই টাকা পর্যাপ্ত নয়। এ কারণে এই অর্থ তাঁরা গ্রহণ করবেন না। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকেও অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় না। ফলে এক বছর পার হওয়ার পরও দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবকদের দুর্বিষহ অবস্থার মধ্য দিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। গতকাল ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা যায়, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি সেভাবেই আছে। এখানে এক বছর আগে মাথা কুটে মরেছে শতাধিক দগ্ধ শিশু শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকের বাঁচার আকুতি। দগ্ধ শরীরে অনেকে ছুটে বেরিয়ে গেছে, হন্যে হয়ে মা-বাবাকে খুঁজে বেরিয়েছে অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে। একটু পানি, একটু ওষুধ, অ্যাম্বুলেন্স, একটু সাহায্য আর চিকিৎসার জন্য ব্যাকুল ছিল তারা। ভবনটির সামনে অস্থায়ী বেড়া দিয়ে ভেতরে প্রবেশ সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। ভবনের সামনে কালো ব্যানারে নিহত শিক্ষার্থীদের সারি সারি ছবি, নিচে নাম, ক্লাস, সেকশন, কোড ও মাধ্যম উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষক ও সহপাঠীরা দোয়া ও ফুল দিয়ে স্মরণ করেছে। ব্যানারে লেখা, ‘এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ, মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।’ আরেক পাশের ব্যানারে নিহত তিন শিক্ষিকা, তিনজন অভিভাবক ও আয়ার ছবি টাঙানো। রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ীতে অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে গত বছরের ২১ জুলাই বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। ওই সময় পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামের সলো ফ্লাইং ছিল। দুপুর ১টার দিকে যুদ্ধবিমানটি ওই স্কুলের মাঠে পড়ে যায় এবং থামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির দোতলার নিচে গিয়ে। এ সময় প্রচণ্ড বিস্ফোরণে নিহত হন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, আয়াসহ মোট ৩৫ জন। অন্যদিকে পাইলট তৌকির ইসলামও ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান। দুর্ঘটনার সময় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দোতলা ভবনটিতে শিক্ষার্থীরা নিশ্চিন্তে ক্লাস করছিল। কেউ বা বাসায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এর ঠিক ১৪ মিনিট পর বিকট শব্দ। চারদিকে ধোঁয়া ও আগুন। নিমেষে গগনবিদারী চিৎকার আর আর্তনাদে ভরে যায় চারদিক। এ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় ২৮ জন শিক্ষার্থী। বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেয় ৮০ জন। আর শুধু জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয় ৫৭ জন। দুর্ঘটনার পর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার তদন্ত কমিশন গঠন করে। ওই কমিশন গত বছর ৪ নভেম্বর সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে দুর্ঘটনার একটি প্রতিবেদন জমা দেয়। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিমানবাহিনীর একটি ‘এফ-৭বিজিআই’ যুদ্ধবিমান মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ‘হায়দার আলী’ ভবনে বিধ্বস্ত হয়।
