রায়পুরে মা ও তিন মেয়েকে হত্যাকাণ্ড: এক বছরের পরিকল্পনা, ভুয়া পরিচয় ও রহস্যের জট—যা জানা গেছে
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌর শহরের ধানহাটা এলাকার নদীপাড়ে সংঘটিত মা ও তিন মেয়েকে নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘিরে তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে নতুন নতুন তথ্য। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র, স্থানীয় বাসিন্দা এবং প্রতিবেশীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, এ হত্যাকাণ্ডটি তাৎক্ষণিক ন...
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌর শহরের ধানহাটা এলাকার নদীপাড়ে সংঘটিত মা ও তিন মেয়েকে নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘিরে তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে নতুন নতুন তথ্য। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র, স্থানীয় বাসিন্দা এবং প্রতিবেশীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, এ হত্যাকাণ্ডটি তাৎক্ষণিক নয়; বরং দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার অংশ হতে পারে। প্রাথমিক তদন্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা, অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার প্রায় এক বছর ধরেই ওই পরিবারকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে পরিকল্পনা করছিলেন। যদিও এ বিষয়ে এখনো তদন্ত শেষ হয়নি এবং পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। ভুয়া পরিচয়ে এলাকায় বসবাস স্থানীয়দের দাবি, অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার প্রকৃত পরিচয় গোপন করে 'জহির' নাম ব্যবহার করতেন। মুসলিম পরিচয় দিয়ে তিনি রায়পুরে একটি বাসা ভাড়া নেন এবং এক নারীকে নিয়ে প্রায় এক বছর একই ভবনে বসবাস করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেশীদের ভাষ্য, তিনি এলাকায় অত্যন্ত স্বাভাবিক আচরণ করতেন। ফলে কেউ তার প্রকৃত পরিচয় বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দেহ করেননি। পরে বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে স্থানীয়রা জানতে পারেন, তার প্রকৃত নাম অন্তর মজুমদার এবং তার বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চর আমানউল্লাহ ইউনিয়নের চর বজলুল্লাহ গ্রামে। নোয়াখালী থেকে লক্ষ্মীপুরে এসে গড়ে তোলেন পরিচয় স্থানীয় সূত্র জানায়, নোয়াখালী থেকে লক্ষ্মীপুরে এসে অন্তর ভ্রাম্যমাণ ফল বিক্রির ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসার আড়ালে তিনি এলাকায় পরিচিতি গড়ে তোলেন এবং ধীরে ধীরে স্থানীয়দের আস্থা অর্জন করেন। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, এই পরিচয় গড়ে তোলার পেছনে কোনো পরিকল্পিত উদ্দেশ্য ছিল কি না। ঘটনার দিনও ভিন্ন পরিচয়ের আশ্রয় প্রতিবেশী আফরোজা বেগম জানান, ঘটনার দিন তিনি অন্তরকে নিহতদের বাসার ভেতরে দেখতে পান। জিজ্ঞাসা করলে অন্তর নিজেকে কল ও পাইপলাইন মেরামতের মিস্ত্রি হিসেবে পরিচয় দেন। তার হাতে একটি প্যান্ট দেখে আফরোজার সন্দেহ হয়। এর কিছুক্ষণ আগেই তিনি ঘরের ভেতর থেকে 'বাঁচাও, বাঁচাও' চিৎকার শুনেছিলেন। চিৎকার হঠাৎ থেমে যাওয়ার পর জানালা দিয়ে একজনকে রান্নাঘরের দিকে যেতে দেখেন তিনি। প্রথমে নিহত শাহীনুর বেগমের ছেলে মনে হলেও পরে কোনো সাড়া না পেয়ে এবং জানালা বন্ধ করার শব্দ শুনে তার সন্দেহ আরও বাড়ে। পরে তিনি বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগিয়ে প্রতিবেশীদের খবর দেন। রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার চারজন প্রতিবেশীরা ঘরে প্রবেশ করে শাহীনুর বেগম এবং তার তিন মেয়ে-সায়মা আক্তার, ইকরা বেগম ও সিপাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি ধারালো দা। পালানোর সময় ভবনের ছাদে উঠে গেলে স্থানীয়রা অন্তরকে আটক করে গণপিটুনি দেন। গুরুতর আহত অবস্থায় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তদন্তে যেসব বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বর্তমানে কয়েকটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছেন- - হত্যাকাণ্ডটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল কি না। - ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে এলাকায় বসবাসের উদ্দেশ্য কী ছিল। - নিহত পরিবারের সঙ্গে অভিযুক্তের পূর্বপরিচয় বা যোগাযোগের ধরন। - হত্যার পেছনে ব্যক্তিগত, আর্থিক বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না। - অভিযুক্ত একাই ঘটনাটি ঘটিয়েছেন, নাকি অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে। তদন্ত অব্যাহত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন পুলিশ, সিআইডি, র্যাব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া জানিয়েছেন, ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে একজনের সম্পৃক্ততার ধারণা পাওয়া গেলেও হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি উদ্ঘাটনে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। দ্রষ্টব্য: প্রতিবেদনের কিছু তথ্য স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র ও প্রাথমিক তদন্তের তথ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। 'এক বছর ধরে পরিকল্পনা' বা 'ভুয়া পরিচয়ে বসবাস'-এসব বিষয় এখনো তদন্তাধীন এবং আদালতে প্রমাণিত নয়।
