সবার ঘরে ঈদের আনন্দ পৌঁছে দিলেও, কেন আজ সাংবাদিকদের নিজের ঘরেই জ্বলছে না উৎসবের প্রদীপ? মালিকপক্ষের স্বেচ্ছাচারিতা নাকি সংগঠনের ব্যর্থতা ঠিক কোথায় আটকে আছে সংবাদকর্মীদের ভাগ্যের চাকা? পর্দার পেছনের সেই রূঢ় বাস্তবতার খোঁজে মালিকপক্ষের উদাসীনতা আর সংগঠ...
সবার ঘরে ঈদের আনন্দ পৌঁছে দিলেও, কেন আজ সাংবাদিকদের নিজের ঘরেই জ্বলছে না উৎসবের প্রদীপ? মালিকপক্ষের স্বেচ্ছাচারিতা নাকি সংগঠনের ব্যর্থতা ঠিক কোথায় আটকে আছে সংবাদকর্মীদের ভাগ্যের চাকা? পর্দার পেছনের সেই রূঢ় বাস্তবতার খোঁজে মালিকপক্ষের উদাসীনতা আর সংগঠনগুলোর কার্যকর ভূমিকার অভাবকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা; অধিকার আদায়ে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি ত্যাগের আহ্বান। ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সুখ ভাগাভাগি করে নেওয়া। কিন্তু বাংলাদেশের সংবাদকর্মীদের একটি বড় অংশের কাছে এই উৎসব এখন বঞ্চনা আর অনিশ্চয়তার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বছরের পর বছর হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে যখন ঈদের আগে ন্যায্য বেতন-ভাতা ও বোনাস জোটে না, তখন সেই উৎসব রূপ নেয় পেশাগত অপমানে। শোষণ বনাম মালিকপক্ষের উদাসীনতা চলতি বছরও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। দেশের বহু গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকরা ঈদের আগে পূর্ণ বেতন তো দূরের কথা, আংশিক পাওনা থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন। অনেক সংবাদকর্মী শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশায় বুক বেঁধেছিলেন যে হয়তো ঈদের আগের দিন পাওনা পরিশোধ হবে, কিন্তু সেই আশাও শেষ পর্যন্ত ভঙ্গ হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, গণমাধ্যম মালিকদের একটি বড় অংশ কেন বারবার শ্রম আইন ও ওয়েজ বোর্ডকে উপেক্ষা করছে? সাংবাদিকদের শ্রমকে তারা যেন ‘ঐচ্ছিক ব্যয়’ হিসেবে গণ্য করছেন, অথচ প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য বিলাসিতায় কোনো কমতি দেখা যায় না। এই চরম বৈষম্যকে সংশ্লিষ্টরা সুস্পষ্ট শোষণ হিসেবে অভিহিত করছেন। ইউনিয়নগুলোর নির্লিপ্ততা ও রাজনৈতিক মেরুকরণ মালিকপক্ষের এই অবহেলার পাশাপাশি সাংবাদিক ইউনিয়নগুলোর ভূমিকা নিয়েও এখন তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। একটি পেশাজীবী সংগঠনের প্রধান কাজ সদস্যদের অধিকার রক্ষা করা হলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে বেতন-ভাতা বকেয়া নিয়ে ইউনিয়নগুলোর পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো আন্দোলন বা চাপ সৃষ্টির উদ্যোগ নেই। অভিযোগ রয়েছে, অনেক সাংবাদিক সংগঠন এখন রাজনৈতিক দলের লেজুরভিত্তিক অঙ্গসংগঠনে পরিণত হয়েছে। তারা পেশাগত স্বার্থের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য প্রদর্শনেই বেশি ব্যস্ত। এই দলদাসের সংস্কৃতি সাংবাদিক সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সংগঠনগুলো আর সাধারণ সদস্যদের ন্যায্য দাবির পক্ষে দাঁড়াতে পারছে না। সদিচ্ছা বনাম সামর্থ্য: প্রশ্ন যেখানে নেতৃত্বের বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা আর প্রতীকী কর্মকাণ্ডে সংগঠনগুলো সক্রিয় থাকলেও বাস্তব সংকটে সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়ানোর দৃশ্য বিরল। ঢাকার বড় সংগঠনগুলো যখন নিষ্ক্রিয়, তখন জেলা পর্যায়ের অনেক ছোট সংগঠন সীমিত সামর্থ্য নিয়েও সদস্যদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে, সংকট আসলে সামর্থ্যের নয় বরং সদিচ্ছার। সংগঠনের অফিসগুলো যদি অধিকার আদায়ের কেন্দ্র না হয়ে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জায়গায় পরিণত হয়, তবে সাধারণ কর্মীদের আস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। উত্তরণের পথ: দায় কার? এই অচলাবস্থা থেকে মুক্তির জন্য বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সুপারিশ করছেন: ১. সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে সব ধরনের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে প্রকৃত পেশাজীবী সংগঠনে রূপান্তর করতে হবে। ২. বকেয়া বেতন-ভাতা আদায়ে দৃশ্যমান ও আপোষহীন আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। ৩. নেতৃত্বের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি সংবাদকর্মীরা যদি উৎসবেও বঞ্চিত হন, তবে এর নেতিবাচক প্রভাব গোটা সমাজের ওপর পড়ে। এই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার দায় মালিকপক্ষ, সরকার বা ইউনিয়ন-কেউই এড়াতে পারে না। এখনই সময় বাস্তব পরিবর্তনের পথে হাঁটার, অন্যথায় ‘আনন্দহীন ঈদ’ আমাদের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক কলঙ্কিত অধ্যায় হয়েই থেকে যাবে।
