লাইভ টিভি
আন্তর্জাতিক

ইরান যুদ্ধ, নাকি দাজ্জালতত্ত্বে মোড়া ‘আমেরিকান ক্রুসেড’!

ইরান যুদ্ধ, নাকি দাজ্জালতত্ত্বে মোড়া ‘আমেরিকান ক্রুসেড’!
ইরান যুদ্ধ, নাকি দাজ্জালতত্ত্বে মোড়া ‘আমেরিকান ক্রুসেড’!

আনারকলি ইস্যুতে শাহজাদা সেলিমের সঙ্গে সম্রাট আকবরের বিরাট ঝামেলা বাধল। বাপ-বেটার বাদশাহি ইগোর কারণে সেই ঝামেলা যুদ্ধে গড়াল। সম্রাট যুদ্ধের সাজ পরলেন। যুদ্ধে যাতে জয় হয়, সে জন্য রাজমহলের রেওয়াজমতো রাজমৌলভি এলেন। আরও এলেন হিন্দু রাজপুরোহিত। দ্বীন-ই-ইলা...

আনারকলি ইস্যুতে শাহজাদা সেলিমের সঙ্গে সম্রাট আকবরের বিরাট ঝামেলা বাধল। বাপ-বেটার বাদশাহি ইগোর কারণে সেই ঝামেলা যুদ্ধে গড়াল। সম্রাট যুদ্ধের সাজ পরলেন। যুদ্ধে যাতে জয় হয়, সে জন্য রাজমহলের রেওয়াজমতো রাজমৌলভি এলেন। আরও এলেন হিন্দু রাজপুরোহিত। দ্বীন-ই-ইলাহি নামের এক অদ্ভুত ‘ধর্ম’ চালু করা সম্রাট আকবরের বাহুতে মৌলভি সাহেব তাবিজ বেঁধে দিলেন। চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে দোয়া করলেন। তারপর ফুঁ দিলেন। এবার রাজপুরোহিত ধান-দূর্বা, ধূপ-ধুনোসহ যাবতীয় নৈবেদ্যভরা পূজার থালা সামনে ধরলেন। তারপর সম্রাটের জয় কামনায় তাঁর কপালে চন্দনের তিলক এঁকে দিলেন। বিড়বিড় করে ‘মহাবলী’র সুরক্ষার জন্য প্রার্থনা করলেন। কে আসিফের পরিচালনায় পৃথ্বীরাজ কাপুরের চোখজুড়ানো অভিনয়ে এই দৃশ্য পঞ্চাশের দশকের বলিউড ক্ল্যাসিক ‘মুঘল-এ-আজম’-এ উঠে এসেছিল। ইতিহাস বলছে, সম্রাট আকবর আর শাহজাদা সেলিমের মধ্যে এ ধরনের কোনো যুদ্ধ আদতে কোনো দিন হয়ওনি, আর যুদ্ধে জেতার জন্য মৌলভি-পুরুত ডেকে মোগল রাজাধিরাজের মাথায় ঝাড়ফুঁক নেওয়ারও দরকার হয়নি। সিনেমায় আমরা বাপ-বেটার যে যুদ্ধ দেখি, সেটি আসলে কাহিনিকারের সিনেম্যাটিক কল্পনা। কে আসিফের পরিচালনায় পৃথ্বীরাজ কাপুরের চোখজুড়ানো অভিনয়ে এই দৃশ্য পঞ্চাশের দশকের বলিউড ক্ল্যাসিক ‘মুঘল-এ-আজম’-এ উঠে এসেছিল। ছবি: সংগৃহীত ‘জিল্লে ইলাহি’ বা ‘ঈশ্বরের প্রতিভূ’ উপাধি ধারণ করা রাজাধিরাজ জালালুদ্দিন মুহম্মদ আকবর ষোড়শ শতকের দুনিয়ায় দাঁড়িয়ে মৌলভি-পুরুত ডেকে তাবিজ-কবচ আর ফুঁ-ফাক্কা নেওয়ার তোয়াক্কা না করলেও আজকের এই একুশ শতকের দুনিয়ার ‘রাজাধিরাজ’ ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে ভিন্ন ঘটনা দেখা যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আর ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে যখন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সমানে পাল্টা মার দিচ্ছিল, ঠিক সে সময় ৫ মার্চ বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে ট্রাম্পকে আমরা মুঘল-এ-আজম-এর সেই দৃশ্যের অবতারণা করতে দেখেছি। ভারতের লোকসভা নির্বাচনের আগে আগে ‘মহর্ষি’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যেভাবে বিভিন্ন তীর্থস্থানে গিয়ে শ খানেক ক্যামেরা ফিট করে ‘রাজনৈতিক ধ্যানে’ বসেন , অনেকটা সেই কায়দায় দেখা গেছে, ওভাল অফিসের রিজোল্যুট ডেস্কে ধ্যানী ভঙিমায় ঝিম মেরে বসে আছেন ট্রাম্প। তাঁর পেছনে লাইন ধরে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছেন ২০ জন লোক। তাঁদের কয়েকজন ট্রাম্পের কাঁধে ও পিঠে আলতো করে হাত রেখেছেন। বাকিরাও সামনে বাহু মেলে ধরে হাতের তালু উবু করে স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে আছেন। ভূতের রাজার বর পাওয়া গুপী গাইন বাঘা বাইন গান শুরু করলে যেমন কেউ নড়নচড়ন করতে পারে না, তেমনিভাবে সারা ঘরের সবাই স্থির হয়ে আছেন। তাঁদের মধ্যে একজন অল্প আওয়াজ করে ধীরে ধীরে প্রার্থনার ভঙ্গিতে কিছু বলছেন; আর বাকিরা সেই কথাগুলো সমস্বরে প্রতিধ্বনি করছেন। আরও পড়ুন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ধর্মের কার্ড ১৭ মার্চ ২০২৬ হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ ড্যান স্ক্যাভিনো এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স হ্যান্ডলে ওই ৫ মার্চই শেয়ার করেছেন । ভিডিওতে যাঁদের দেখা গেছে, তাঁরা সবাই ধর্মযাজক ও ধর্মীয় নেতা। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন প্যাস্টর পদমর্যাদার যাজক। বাকিরা কট্টরপন্থী বর্ণবাদী ইভানজেলিক্যাল ধর্মগুরু। আমাদের এখানে গ্রামগঞ্জে যে কায়দায় ‘বাণ মারা-বাণ ফিরানো’ ফকির-ওঝা ডেকে গেরস্তের বালামসিবত দূর করা হয় কিংবা কপালের ‘ফাঁড়া’ কাটানো হয়, অনেকটা সেই কায়দায় ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধজনিত ফাড়া কাটানোর জন্য এই বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, হোয়াইট হাউসের ‘ফেইথ অফিস’-এর প্রধান (যিনি কিনা দীর্ঘ সময় ধরে ট্রাম্পের আধ্যাত্মিক পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন) নারী প্যাস্টর পলা হোয়াইট উদ্যোগ নিয়ে এই যাজকদের জড়ো করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ক্রাইস্ট ফেলোশিপ চার্চের প্রতিষ্ঠাতা প্যাস্টর টম মিউলিন্স, ক্যালিফোর্নিয়ার মেগা চার্চের প্যাস্টর গ্রেগ লরি, প্যাস্টর জেন্টেজেন ফ্র্যাঙ্কলিন ও ইভানজেলিক্যাল নেতা জনি মুরের মতো ধর্মীয় নেতারা। তাঁরা মোটেও যেনতেন ধরনের ধর্মীয় নেতা না। আমেরিকার রাজনীতিতে তাঁরা সাংঘাতিক প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর। যুদ্ধে জয় পাওয়ার জন্য আমেরিকার কোনো প্রেসিডেন্ট কস্মিনকালে হোয়াইট হাউসে এ ধরনের সম্মিলিত প্রার্থনার আয়োজন করেননি; কিন্তু ট্রাম্প করেছেন। ছবি: সংগৃহীত ভিডিওতে দেখা যায়, প্যাস্টর টম মিউলিন্স ‘যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য’ মাখানো গলায় ঈশ্বরকে উদ্দেশ করে বলতে থাকেন, ‘আমরা প্রার্থনা করি, আপনার আশীর্বাদ ও কৃপা তাঁর (ট্রাম্পের) ওপর বর্ষিত হোক। আমরা প্রার্থনা করি, স্বর্গীয় জ্ঞান তাঁর হৃদয় ও মনকে দিকনির্দেশনা দিক, যেন আপনি এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে তাঁর পথপ্রদর্শক হন। প্রার্থনা করি, আপনার অনুগ্রহ ও সুরক্ষা তাঁর ওপর বর্ষিত হোক…এবং আমাদের সৈন্যদের ওপরও বর্ষিত হোক। পিতা, আমরা প্রার্থনা করি, আপনি আমাদের প্রেসিডেন্টকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি দিন।...আমরা প্রার্থনা করি, যিশুর নামে আপনার স্বর্গীয় আশীর্বাদ তাঁর ওপর বর্ষিত হোক।’ মিউলিন্সের সঙ্গে বাকিরাও এই প্রার্থনাবাক্য স্তোত্রপাঠের মতো করে আবৃত্তি করেন। যুদ্ধে জয় পাওয়ার জন্য আমেরিকার কোনো প্রেসিডেন্ট কস্মিনকালে হোয়াইট হাউসে এ ধরনের সম্মিলিত প্রার্থনার আয়োজন করেননি; কিন্তু ট্রাম্প করেছেন। শুধু তা-ই নয়, সেই দৃশ্য যাতে সবাই দেখতে পারেন, সে জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ভিডিও ছড়ানোর ব্যবস্থাও করেছেন। ট্রাম্পের ‘সাদাবাড়ি’র প্রার্থনাসভার তিন দিন পর, অর্থাৎ ৮ মার্চ তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাম যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ সিবিএস নিউজের ‘সিক্সটি মিনিটস’ অনুষ্ঠানে আসেন । সেখানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধে ঈশ্বর আমেরিকার সঙ্গে আছেন। তিনি বলেন, ‘আমেরিকার সংকল্প নিয়ে ইরানের সন্দেহ থাকা ঠিক হবে না। কারণ, আমেরিকার পেছনে মহাশক্তির সমর্থন আছে।...সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের প্রভিডেন্স আমাদের সৈন্যদের রক্ষা করছে।’ সিবিএসের সাংবাদিক মেজর গ্যারেট তখন হেগসেথের কাছে জানতে চান, তিনি কি এই যুদ্ধকে ধর্মীয় যুদ্ধ হিসেবে দেখছেন? জবাবে হেগসেথ বলেন, ‘দেখুন, আমরা সোজাসুজিই বলেছি, আমরা এমন একটা ধর্মীয় উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে লড়ছি, যারা একটি ধর্মীয় “আর্মাগেডন” (বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণীতে উল্লেখ করা পৃথিবীর শেষ মহাযুদ্ধ) ঘটানোর লক্ষ্যে পরমাণু বোমা বানানোর চেষ্টায় আছে।’ হেগসেথ আরও বলেন, এই যুদ্ধে আমেরিকান সেনাদের সঙ্গে ‘সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের সংযোগ থাকা দরকার।’ এর দুই দিন পর, অর্থাৎ ১০ মার্চ ইরান যুদ্ধে নিহত হওয়া সেনাদের মরদেহ গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে পেন্টাগনে সংবাদ সম্মেলনে হেগসেথ বাইবেলের বুক অব সালমস্-এর ১৪৪ নম্বর গীতসংহিতা উদ্ধৃত করেন। সেখানে বলা আছে, ‘ধন্য সেই প্রভু, যিনি আমার অজেয় শিলা; যিনি যুদ্ধের জন্য আমার হাতকে এবং যুদ্ধকৌশলের জন্য আমার আঙুলকে প্রশিক্ষণ দেন।’ মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ২০২৫ সালের ২৮ নভেম্বর ওয়াশিংটন ডিসির ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়া আর্মরিতে ন্যাশনাল গার্ড সদস্যদের সঙ্গে প্রার্থনায় অংশ নেন। ছবি: যুক্তরাষ্ট্র আর্মি ন্যাশনাল গার্ডের ওয়েব সাইট থেকে নেওয়া ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ বানাতে ধর্মযুদ্ধ? গত ২০ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি বিখ্যাত মার্কিন টিভি উপস্থাপক টাকার কার্লসনের সঙ্গে পডকাস্ট আলাপচারিতায় বসেছিলেন । সেখানে এক পর্যায়ে হাকাবি বলে ফেলেন, ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের সবটা নিয়ে নিলে ভালোই হয়; কারণ এই ভূমির প্রতিশ্রুতি তিন হাজার বছর আগেই ঈশ্বর তাঁদের দিয়ে রেখেছেন। এ সময় উপস্থাপক কার্লসন ওল্ড টেস্টামেন্ট বা পুরাতন বাইবেলের জেনেসিস ১৫: ১৮ শ্লোক উল্লেখ করেন। ওই শ্লোকে ঈশ্বর আব্রাহামকে (ইসলামে যিনি হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম) প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ‘তোমার বংশধরদের জন্য আমি নীল নদ থেকে বড় ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত বিস্তৃত এই ভূমি দিয়েছি।’ কার্লসন এরপর হাকাবিকে বলেন, ‘লেভান্ট অঞ্চল অর্থাৎ ইসরায়েল, জর্ডান, সিরিয়া ও লেবাননের পাশাপাশি সৌদি আরব ও ইরাকের বড় অংশও ওই প্রতিশ্রুত এলাকার মধ্যে পড়ে যাবে।’ জবাবে হাকাবি বলেন, ‘এটা ঠিক, এতটা বড় হবে কি না, আমি নিশ্চিত নই; তবে এটা নিঃসন্দেহে একটি বড় ভূখণ্ড।’ তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল এমন একটি ভূমি, যা ঈশ্বর আব্রাহামের মাধ্যমে তাঁর নির্বাচিত একটি জাতিকে দিয়েছেন।’ এরপর কার্লসন সরাসরি প্রশ্ন করেন, ‘ইসরায়েলের কি সেই পুরো ভূখণ্ডের ওপর অধিকার আছে?’ উত্তরে হাকাবি বলেন, ‘তারা সবটা নিতে পারলে তো ভালোই।’ অর্থাৎ ইসরায়েলে নিযুক্ত এই যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মনে করেন, পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে ইসরায়েলের গিলে ফেলার সম্পূর্ণ অধিকার আছে। আর সেই পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে তাঁরা আপাতত ইরানকেই দেখছেন। ইসরায়েলের নেতারা বহু আগে থেকেই খোলাখুলি বলে আসছেন, তাঁরা শুধু ইহজাগতিক রাজনৈতিক মোক্ষলাভের জন্য রাজনীতি করেন না। ঈশ্বর তাঁদের যে ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’-এর প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছেন, তা প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনীতি করেন এবং যুদ্ধ করেন। মিডল ইস্ট মনিটরের এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ওই সময় আইডিএফের সেনাদের পোশাকে লাগানো ব্যাজে ইসরায়েলের পতাকার ছবির নিচে স্পষ্ট করে তাদের স্বপ্নের ‘গ্রেটার ইসরায়েল’-এর ম্যাপ আঁকা ছিল। ছবি: সংগৃহীত এই ‘ বৃহত্তর ইসরায়েল ’ প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা যে কতখানি প্রবল, তা ২০২৪ সালে গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চালানোর সময় ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সের (আইডিএফ) সেনাদের খাকি পোশাকে সেঁটে দেওয়া সামরিক ব্যাজের দিকে খেয়াল করলে বোঝা যাবে। মিডল ইস্ট মনিটর -এর এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে , ওই সময় আইডিএফের সেনাদের পোশাকে লাগানো ব্যাজে ইসরায়েলের পতাকার ছবির নিচে স্পষ্ট করে তাদের স্বপ্নের ‘গ্রেটার ইসরায়েল’-এর ম্যাপ আঁকা ছিল। এটি আরব দেশগুলোর মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল। ওই সময় সরকারিভাবে আইডিএফ সদস্যদের বলে দেওয়া হয়, তাঁদের ধর্মগ্রন্থে যে মসিহ বা ত্রাতা আসবেন বলে ভবিষ্যদ্বাণী করা আছে, সেই মসিহর আগমনের প্রেক্ষাপট ও প্রতিবেশ তৈরির জন্যই তাঁরা এই যুদ্ধ করছেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ১৩ মার্চ শুক্রবার দেওয়া ভাষণে (যদিও এই ভাষণ আদৌ নেতানিয়াহু দিয়েছেন, নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বানানো ভিডিও প্রচার করা হয়েছে, তা নিয়ে এখন প্রবল সন্দেহ দেখা দিয়েছে। গুঞ্জন রটেছে, নেতানিয়াহু ইতিমধ্যে নিহত বা গুরুতর আহত হয়েছেন) বলেছেন, ‘আমরা সেই রাজ্য প্রতিষ্ঠা করব এবং মসিহর আসা নিশ্চিত করব।’ অর্থাৎ ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু এবং তাঁদের সরকারের একেবারে মাথার দিকের নেতাদের কথাবার্তা শুনলে এবং তাঁদের কাজকারবার দেখলে বোঝা যাবে, ইরান যুদ্ধকে তাঁরা নেহাত রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের ঝগড়াঝাঁটি কিংবা সামরিকভাবে একে অন্যকে দেখে নেওয়ার বিষয় হিসেবে দেখছেন না; বরং তাঁরা পুরো পরিস্থিতিকে একটি বাইবেলীয় ভবিষ্যদ্বাণীর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন এবং সেই মনোভঙ্গি থেকেই মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তাঁদের অনেকেই ইতিমধ্যে বলে ফেলেছেন, ওল্ড টেস্টামেন্টে ‘আর্মাগেডন’ বা ‘চূড়ান্ত যুদ্ধের’ (ইসলামের পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘ মালহামাতুল কুবরা ’ বা কিয়ামতের পূর্বে সংঘটিতব্য মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী মহাযুদ্ধ) প্রেক্ষাপট ইরান যুদ্ধের মধ্য দিয়েই সূচিত হতে যাচ্ছে।

NewstimesNewstimes
ইরান যুদ্ধ, নাকি দাজ্জালতত্ত্বে মোড়া ‘আমেরিকান ক্রুসেড’!

আনারকলি ইস্যুতে শাহজাদা সেলিমের সঙ্গে সম্রাট আকবরের বিরাট ঝামেলা বাধল। বাপ-বেটার বাদশাহি ইগোর কারণে সেই ঝামেলা যুদ্ধে গড়াল। সম্রাট যুদ্ধের সাজ পরলেন। যুদ্ধে যাতে জয় হয়, সে জন্য রাজমহলের রেওয়াজমতো রাজমৌলভি এলেন। আরও এলেন হিন্দু রাজপুরোহিত। দ্বীন-ই-ইলা...

নিউজ টাইমস ডেস্ক

আনারকলি ইস্যুতে শাহজাদা সেলিমের সঙ্গে সম্রাট আকবরের বিরাট ঝামেলা বাধল। বাপ-বেটার বাদশাহি ইগোর কারণে সেই ঝামেলা যুদ্ধে গড়াল। সম্রাট যুদ্ধের সাজ পরলেন। যুদ্ধে যাতে জয় হয়, সে জন্য রাজমহলের রেওয়াজমতো রাজমৌলভি এলেন। আরও এলেন হিন্দু রাজপুরোহিত। দ্বীন-ই-ইলাহি নামের এক অদ্ভুত ‘ধর্ম’ চালু করা সম্রাট আকবরের বাহুতে মৌলভি সাহেব তাবিজ বেঁধে দিলেন। চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে দোয়া করলেন। তারপর ফুঁ দিলেন। এবার রাজপুরোহিত ধান-দূর্বা, ধূপ-ধুনোসহ যাবতীয় নৈবেদ্যভরা পূজার থালা সামনে ধরলেন। তারপর সম্রাটের জয় কামনায় তাঁর কপালে চন্দনের তিলক এঁকে দিলেন। বিড়বিড় করে ‘মহাবলী’র সুরক্ষার জন্য প্রার্থনা করলেন। কে আসিফের পরিচালনায় পৃথ্বীরাজ কাপুরের চোখজুড়ানো অভিনয়ে এই দৃশ্য পঞ্চাশের দশকের বলিউড ক্ল্যাসিক ‘মুঘল-এ-আজম’-এ উঠে এসেছিল। ইতিহাস বলছে, সম্রাট আকবর আর শাহজাদা সেলিমের মধ্যে এ ধরনের কোনো যুদ্ধ আদতে কোনো দিন হয়ওনি, আর যুদ্ধে জেতার জন্য মৌলভি-পুরুত ডেকে মোগল রাজাধিরাজের মাথায় ঝাড়ফুঁক নেওয়ারও দরকার হয়নি। সিনেমায় আমরা বাপ-বেটার যে যুদ্ধ দেখি, সেটি আসলে কাহিনিকারের সিনেম্যাটিক কল্পনা। কে আসিফের পরিচালনায় পৃথ্বীরাজ কাপুরের চোখজুড়ানো অভিনয়ে এই দৃশ্য পঞ্চাশের দশকের বলিউড ক্ল্যাসিক ‘মুঘল-এ-আজম’-এ উঠে এসেছিল। ছবি: সংগৃহীত ‘জিল্লে ইলাহি’ বা ‘ঈশ্বরের প্রতিভূ’ উপাধি ধারণ করা রাজাধিরাজ জালালুদ্দিন মুহম্মদ আকবর ষোড়শ শতকের দুনিয়ায় দাঁড়িয়ে মৌলভি-পুরুত ডেকে তাবিজ-কবচ আর ফুঁ-ফাক্কা নেওয়ার তোয়াক্কা না করলেও আজকের এই একুশ শতকের দুনিয়ার ‘রাজাধিরাজ’ ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে ভিন্ন ঘটনা দেখা যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আর ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে যখন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সমানে পাল্টা মার দিচ্ছিল, ঠিক সে সময় ৫ মার্চ বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে ট্রাম্পকে আমরা মুঘল-এ-আজম-এর সেই দৃশ্যের অবতারণা করতে দেখেছি। ভারতের লোকসভা নির্বাচনের আগে আগে ‘মহর্ষি’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যেভাবে বিভিন্ন তীর্থস্থানে গিয়ে শ খানেক ক্যামেরা ফিট করে ‘রাজনৈতিক ধ্যানে’ বসেন , অনেকটা সেই কায়দায় দেখা গেছে, ওভাল অফিসের রিজোল্যুট ডেস্কে ধ্যানী ভঙিমায় ঝিম মেরে বসে আছেন ট্রাম্প। তাঁর পেছনে লাইন ধরে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছেন ২০ জন লোক। তাঁদের কয়েকজন ট্রাম্পের কাঁধে ও পিঠে আলতো করে হাত রেখেছেন। বাকিরাও সামনে বাহু মেলে ধরে হাতের তালু উবু করে স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে আছেন। ভূতের রাজার বর পাওয়া গুপী গাইন বাঘা বাইন গান শুরু করলে যেমন কেউ নড়নচড়ন করতে পারে না, তেমনিভাবে সারা ঘরের সবাই স্থির হয়ে আছেন। তাঁদের মধ্যে একজন অল্প আওয়াজ করে ধীরে ধীরে প্রার্থনার ভঙ্গিতে কিছু বলছেন; আর বাকিরা সেই কথাগুলো সমস্বরে প্রতিধ্বনি করছেন। আরও পড়ুন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ধর্মের কার্ড ১৭ মার্চ ২০২৬ হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ ড্যান স্ক্যাভিনো এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স হ্যান্ডলে ওই ৫ মার্চই শেয়ার করেছেন । ভিডিওতে যাঁদের দেখা গেছে, তাঁরা সবাই ধর্মযাজক ও ধর্মীয় নেতা। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন প্যাস্টর পদমর্যাদার যাজক। বাকিরা কট্টরপন্থী বর্ণবাদী ইভানজেলিক্যাল ধর্মগুরু। আমাদের এখানে গ্রামগঞ্জে যে কায়দায় ‘বাণ মারা-বাণ ফিরানো’ ফকির-ওঝা ডেকে গেরস্তের বালামসিবত দূর করা হয় কিংবা কপালের ‘ফাঁড়া’ কাটানো হয়, অনেকটা সেই কায়দায় ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধজনিত ফাড়া কাটানোর জন্য এই বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, হোয়াইট হাউসের ‘ফেইথ অফিস’-এর প্রধান (যিনি কিনা দীর্ঘ সময় ধরে ট্রাম্পের আধ্যাত্মিক পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন) নারী প্যাস্টর পলা হোয়াইট উদ্যোগ নিয়ে এই যাজকদের জড়ো করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ক্রাইস্ট ফেলোশিপ চার্চের প্রতিষ্ঠাতা প্যাস্টর টম মিউলিন্স, ক্যালিফোর্নিয়ার মেগা চার্চের প্যাস্টর গ্রেগ লরি, প্যাস্টর জেন্টেজেন ফ্র্যাঙ্কলিন ও ইভানজেলিক্যাল নেতা জনি মুরের মতো ধর্মীয় নেতারা। তাঁরা মোটেও যেনতেন ধরনের ধর্মীয় নেতা না। আমেরিকার রাজনীতিতে তাঁরা সাংঘাতিক প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর। যুদ্ধে জয় পাওয়ার জন্য আমেরিকার কোনো প্রেসিডেন্ট কস্মিনকালে হোয়াইট হাউসে এ ধরনের সম্মিলিত প্রার্থনার আয়োজন করেননি; কিন্তু ট্রাম্প করেছেন। ছবি: সংগৃহীত ভিডিওতে দেখা যায়, প্যাস্টর টম মিউলিন্স ‘যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য’ মাখানো গলায় ঈশ্বরকে উদ্দেশ করে বলতে থাকেন, ‘আমরা প্রার্থনা করি, আপনার আশীর্বাদ ও কৃপা তাঁর (ট্রাম্পের) ওপর বর্ষিত হোক। আমরা প্রার্থনা করি, স্বর্গীয় জ্ঞান তাঁর হৃদয় ও মনকে দিকনির্দেশনা দিক, যেন আপনি এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে তাঁর পথপ্রদর্শক হন। প্রার্থনা করি, আপনার অনুগ্রহ ও সুরক্ষা তাঁর ওপর বর্ষিত হোক…এবং আমাদের সৈন্যদের ওপরও বর্ষিত হোক। পিতা, আমরা প্রার্থনা করি, আপনি আমাদের প্রেসিডেন্টকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি দিন।...আমরা প্রার্থনা করি, যিশুর নামে আপনার স্বর্গীয় আশীর্বাদ তাঁর ওপর বর্ষিত হোক।’ মিউলিন্সের সঙ্গে বাকিরাও এই প্রার্থনাবাক্য স্তোত্রপাঠের মতো করে আবৃত্তি করেন। যুদ্ধে জয় পাওয়ার জন্য আমেরিকার কোনো প্রেসিডেন্ট কস্মিনকালে হোয়াইট হাউসে এ ধরনের সম্মিলিত প্রার্থনার আয়োজন করেননি; কিন্তু ট্রাম্প করেছেন। শুধু তা-ই নয়, সেই দৃশ্য যাতে সবাই দেখতে পারেন, সে জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ভিডিও ছড়ানোর ব্যবস্থাও করেছেন। ট্রাম্পের ‘সাদাবাড়ি’র প্রার্থনাসভার তিন দিন পর, অর্থাৎ ৮ মার্চ তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাম যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ সিবিএস নিউজের ‘সিক্সটি মিনিটস’ অনুষ্ঠানে আসেন । সেখানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধে ঈশ্বর আমেরিকার সঙ্গে আছেন। তিনি বলেন, ‘আমেরিকার সংকল্প নিয়ে ইরানের সন্দেহ থাকা ঠিক হবে না। কারণ, আমেরিকার পেছনে মহাশক্তির সমর্থন আছে।...সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের প্রভিডেন্স আমাদের সৈন্যদের রক্ষা করছে।’ সিবিএসের সাংবাদিক মেজর গ্যারেট তখন হেগসেথের কাছে জানতে চান, তিনি কি এই যুদ্ধকে ধর্মীয় যুদ্ধ হিসেবে দেখছেন? জবাবে হেগসেথ বলেন, ‘দেখুন, আমরা সোজাসুজিই বলেছি, আমরা এমন একটা ধর্মীয় উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে লড়ছি, যারা একটি ধর্মীয় “আর্মাগেডন” (বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণীতে উল্লেখ করা পৃথিবীর শেষ মহাযুদ্ধ) ঘটানোর লক্ষ্যে পরমাণু বোমা বানানোর চেষ্টায় আছে।’ হেগসেথ আরও বলেন, এই যুদ্ধে আমেরিকান সেনাদের সঙ্গে ‘সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের সংযোগ থাকা দরকার।’ এর দুই দিন পর, অর্থাৎ ১০ মার্চ ইরান যুদ্ধে নিহত হওয়া সেনাদের মরদেহ গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে পেন্টাগনে সংবাদ সম্মেলনে হেগসেথ বাইবেলের বুক অব সালমস্-এর ১৪৪ নম্বর গীতসংহিতা উদ্ধৃত করেন। সেখানে বলা আছে, ‘ধন্য সেই প্রভু, যিনি আমার অজেয় শিলা; যিনি যুদ্ধের জন্য আমার হাতকে এবং যুদ্ধকৌশলের জন্য আমার আঙুলকে প্রশিক্ষণ দেন।’ মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ২০২৫ সালের ২৮ নভেম্বর ওয়াশিংটন ডিসির ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়া আর্মরিতে ন্যাশনাল গার্ড সদস্যদের সঙ্গে প্রার্থনায় অংশ নেন। ছবি: যুক্তরাষ্ট্র আর্মি ন্যাশনাল গার্ডের ওয়েব সাইট থেকে নেওয়া ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ বানাতে ধর্মযুদ্ধ? গত ২০ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি বিখ্যাত মার্কিন টিভি উপস্থাপক টাকার কার্লসনের সঙ্গে পডকাস্ট আলাপচারিতায় বসেছিলেন । সেখানে এক পর্যায়ে হাকাবি বলে ফেলেন, ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের সবটা নিয়ে নিলে ভালোই হয়; কারণ এই ভূমির প্রতিশ্রুতি তিন হাজার বছর আগেই ঈশ্বর তাঁদের দিয়ে রেখেছেন। এ সময় উপস্থাপক কার্লসন ওল্ড টেস্টামেন্ট বা পুরাতন বাইবেলের জেনেসিস ১৫: ১৮ শ্লোক উল্লেখ করেন। ওই শ্লোকে ঈশ্বর আব্রাহামকে (ইসলামে যিনি হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম) প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ‘তোমার বংশধরদের জন্য আমি নীল নদ থেকে বড় ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত বিস্তৃত এই ভূমি দিয়েছি।’ কার্লসন এরপর হাকাবিকে বলেন, ‘লেভান্ট অঞ্চল অর্থাৎ ইসরায়েল, জর্ডান, সিরিয়া ও লেবাননের পাশাপাশি সৌদি আরব ও ইরাকের বড় অংশও ওই প্রতিশ্রুত এলাকার মধ্যে পড়ে যাবে।’ জবাবে হাকাবি বলেন, ‘এটা ঠিক, এতটা বড় হবে কি না, আমি নিশ্চিত নই; তবে এটা নিঃসন্দেহে একটি বড় ভূখণ্ড।’ তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল এমন একটি ভূমি, যা ঈশ্বর আব্রাহামের মাধ্যমে তাঁর নির্বাচিত একটি জাতিকে দিয়েছেন।’ এরপর কার্লসন সরাসরি প্রশ্ন করেন, ‘ইসরায়েলের কি সেই পুরো ভূখণ্ডের ওপর অধিকার আছে?’ উত্তরে হাকাবি বলেন, ‘তারা সবটা নিতে পারলে তো ভালোই।’ অর্থাৎ ইসরায়েলে নিযুক্ত এই যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মনে করেন, পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে ইসরায়েলের গিলে ফেলার সম্পূর্ণ অধিকার আছে। আর সেই পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে তাঁরা আপাতত ইরানকেই দেখছেন। ইসরায়েলের নেতারা বহু আগে থেকেই খোলাখুলি বলে আসছেন, তাঁরা শুধু ইহজাগতিক রাজনৈতিক মোক্ষলাভের জন্য রাজনীতি করেন না। ঈশ্বর তাঁদের যে ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’-এর প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছেন, তা প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনীতি করেন এবং যুদ্ধ করেন। মিডল ইস্ট মনিটরের এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ওই সময় আইডিএফের সেনাদের পোশাকে লাগানো ব্যাজে ইসরায়েলের পতাকার ছবির নিচে স্পষ্ট করে তাদের স্বপ্নের ‘গ্রেটার ইসরায়েল’-এর ম্যাপ আঁকা ছিল। ছবি: সংগৃহীত এই ‘ বৃহত্তর ইসরায়েল ’ প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা যে কতখানি প্রবল, তা ২০২৪ সালে গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চালানোর সময় ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সের (আইডিএফ) সেনাদের খাকি পোশাকে সেঁটে দেওয়া সামরিক ব্যাজের দিকে খেয়াল করলে বোঝা যাবে। মিডল ইস্ট মনিটর -এর এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে , ওই সময় আইডিএফের সেনাদের পোশাকে লাগানো ব্যাজে ইসরায়েলের পতাকার ছবির নিচে স্পষ্ট করে তাদের স্বপ্নের ‘গ্রেটার ইসরায়েল’-এর ম্যাপ আঁকা ছিল। এটি আরব দেশগুলোর মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল। ওই সময় সরকারিভাবে আইডিএফ সদস্যদের বলে দেওয়া হয়, তাঁদের ধর্মগ্রন্থে যে মসিহ বা ত্রাতা আসবেন বলে ভবিষ্যদ্বাণী করা আছে, সেই মসিহর আগমনের প্রেক্ষাপট ও প্রতিবেশ তৈরির জন্যই তাঁরা এই যুদ্ধ করছেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ১৩ মার্চ শুক্রবার দেওয়া ভাষণে (যদিও এই ভাষণ আদৌ নেতানিয়াহু দিয়েছেন, নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বানানো ভিডিও প্রচার করা হয়েছে, তা নিয়ে এখন প্রবল সন্দেহ দেখা দিয়েছে। গুঞ্জন রটেছে, নেতানিয়াহু ইতিমধ্যে নিহত বা গুরুতর আহত হয়েছেন) বলেছেন, ‘আমরা সেই রাজ্য প্রতিষ্ঠা করব এবং মসিহর আসা নিশ্চিত করব।’ অর্থাৎ ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু এবং তাঁদের সরকারের একেবারে মাথার দিকের নেতাদের কথাবার্তা শুনলে এবং তাঁদের কাজকারবার দেখলে বোঝা যাবে, ইরান যুদ্ধকে তাঁরা নেহাত রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের ঝগড়াঝাঁটি কিংবা সামরিকভাবে একে অন্যকে দেখে নেওয়ার বিষয় হিসেবে দেখছেন না; বরং তাঁরা পুরো পরিস্থিতিকে একটি বাইবেলীয় ভবিষ্যদ্বাণীর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন এবং সেই মনোভঙ্গি থেকেই মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তাঁদের অনেকেই ইতিমধ্যে বলে ফেলেছেন, ওল্ড টেস্টামেন্টে ‘আর্মাগেডন’ বা ‘চূড়ান্ত যুদ্ধের’ (ইসলামের পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘ মালহামাতুল কুবরা ’ বা কিয়ামতের পূর্বে সংঘটিতব্য মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী মহাযুদ্ধ) প্রেক্ষাপট ইরান যুদ্ধের মধ্য দিয়েই সূচিত হতে যাচ্ছে।

নিবন্ধের রেফারেন্স লিংক
নিবন্ধের রেফারেন্স লিংক/article/g9bjddt3Cz9s